আগস্টে পাকিস্তানের তিন টেস্টের ইংল্যান্ড সফরের দুটি ম্যাচ শেষ হয়েছে, দুটিতেই জিতেছে ইংল্যান্ড — সিরিজ ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়ে গেছে। নিচে দুই ম্যাচের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা।
১ম টেস্ট (লিডস): তিন দিনেই শেষ, ইনিংস ও ১০৩ রানে জিতল ইংল্যান্ড
সিরিজের প্রথম ম্যাচে অধিনায়ক Babar Azam চোটের কারণে ম্যাচের আগের দিন ছিটকে যাওয়ায় পাকিস্তানকে খেলতে হয়েছে তাকে ছাড়াই, প্রথমবারের মতো টেস্ট অধিনায়কত্ব পান Salman Ali Agha। ম্যাচ বেশিদিন গড়ায়নি — আগে ব্যাট করে ইংল্যান্ড ৮ উইকেটে ৩৬৬ রানে ইনিংস ঘোষণা করে, যেখানে Harry Brook-এর ৯১ রান ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল ইনিংস; পাকিস্তান দুই ইনিংসে যথাক্রমে মাত্র ১৭১ ও ১৩৫ রানে অলআউট হয়, দুবারই ইংল্যান্ডের পেস আক্রমণের সামনে পুরোপুরি ধসে পড়ে।
বল হাতে এই ম্যাচের মূল নায়ক ছিলেন Ollie Robinson ও Josh Tongue — দুজনেই দুই ইনিংস মিলিয়ে আটটি করে উইকেট নেন। রবিনসন ৮০ রানে ৮ উইকেট (৫১ রানে ৫, পরে ২৯ রানে ৩) নিয়ে ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন, আর টাং নেন ৮৯ রানে ৮ উইকেট (প্রথম ইনিংসে ৪৬ রানে ৫ সহ); Jofra Archer আরও তিনটি উইকেট যোগ করেন, তিনজন মিলে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ পুরোপুরি ভেঙে দেন। পাকিস্তানের একমাত্র উজ্জ্বল দিক ছিল Abdullah Shafique-র ৬১ রান আর Ali Usman-এর ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ উইকেট শিকার, কিন্তু তিন দিনেই হার ঠেকাতে তা যথেষ্ট হয়নি।
২য় টেস্ট (লর্ডস): বৃষ্টিও রবিনসনের হাত থেকে পাকিস্তানকে বাঁচাতে পারেনি, ১৯৪ রানে জয় ইংল্যান্ডের
সিরিজ এবার লর্ডসে গড়ায়, যেখানে বৃষ্টি কিছুটা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল — তৃতীয় দিনে মাত্র ২৪.৫ ওভার খেলা সম্ভব হয়েছিল বৃষ্টির কারণে — কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফলাফল বদলায়নি। ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে ২৯০ রানের নেতৃত্বে ছিলেন Jamie Smith-এর ৬১ রান, দ্বিতীয় ইনিংসে ২০৮ রানে নেতৃত্ব দেন Dan Lawrence তার ৫৪ রান দিয়ে; জবাবে পাকিস্তান করে মাত্র ১১০ ও ১৯৪ রান, দ্বিতীয় ইনিংসে Saud Shakeel ৯৭ রান করে সেঞ্চুরির কাছাকাছি পৌঁছেও পারেননি — ইংল্যান্ড জেতে ১৯৪ রানে।
এই ম্যাচে রবিনসনের পারফরম্যান্স প্রথম টেস্টকেও ছাড়িয়ে যায় — মাত্র ২৭ ওভার বল করে ৩৫ রানে ৮ উইকেট (৪/১১ ও ৪/২৪), টানা দ্বিতীয় ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচ। Jofra Archer এই ম্যাচেও যোগ করেন আরও পাঁচ উইকেট। এই পর্যন্ত দুই টেস্ট মিলিয়ে রবিনসন ও আর্চার একসাথে পাকিস্তানের ৩৮ উইকেটের মধ্যে ২৪টি নিয়েছেন, ইংল্যান্ডের দুই জয়ের সবচেয়ে বড় কারিগর তারাই। পাকিস্তানের পক্ষে একমাত্র উজ্জ্বল দিক ছিলেন Mohammad Abbas — দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৭ রানে ৫ উইকেট নিয়ে লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নাম লেখান তিনি, পুরো ম্যাচে তার ঝুলিতে ৯ উইকেট, যা এই ম্যাচে পাকিস্তানের একমাত্র উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি।
বোলিং ভাঙন-বিশ্লেষণ: ইংল্যান্ডের বহুস্তর অস্ত্র বনাম একাই লড়াই করা আব্বাস
সিরিজটা ভালোভাবে ভেঙে দেখলে দুই দলের বোলিং আক্রমণের পার্থক্য আসলে ফলাফলের চেয়েও বেশি আগ্রহোদ্দীপক। ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তাদের আক্রমণের বৈচিত্র্য। রবিনসন খেলেন নিখুঁত নিয়ন্ত্রণের ঘরানায় — ঘণ্টায় প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ মাইল গতিতে বল করেন, প্রায় নিখুঁত রিলিজ ও সিম পজিশনের ওপর ভর করে অফ স্টাম্পের বাইরে একটা সরু করিডোরে বল বেঁধে রেখে ব্যাটসম্যানদের ভুল করতে বাধ্য করেন, গতির চেয়ে নিয়ন্ত্রণই তার আসল অস্ত্র; তার এই ঘরানা প্রায়ই গ্লেন ম্যাকগ্রার সাথে তুলনা করা হয়, আর এই মৌসুমে তার গড় প্রায় ২৩ রান প্রতি উইকেট — বর্তমানে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে ধারাবাহিক মিডিয়াম-পেসারদের একজন তিনি। প্রকৃত ভীতি তৈরি করেন আর্চার — তার গতি এমন পর্যায়ের যা পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা সিরিজের আগে নেটেও অনুশীলন করে অভ্যস্ত হতে পারেননি, সঙ্গে গাস অ্যাটকিনসন মাঝে মাঝে প্রায় ৯০ মাইল গতিতে বল করে স্টাম্প লক্ষ্য করে একটানা আক্রমণ চালান, ফলে ব্যাটসম্যানরা নিরাপদে ছেড়ে দেওয়ার মতো বল প্রায় পাননি বললেই চলে। টাং ঘূর্ণায়মান বোলার হিসেবে বাড়তি গভীরতা যোগ করেন। সব মিলিয়ে এমন এক আক্রমণ যেখানে একজন গতি দিয়ে ভয় দেখান, আরেকজন নিয়ন্ত্রণ দিয়ে ক্লান্ত করে তোলেন — দুই ম্যাচেই পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ কার্যত নিঃশ্বাস ফেলার সময় পায়নি।
অন্যদিকে পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণ কার্যত একাই টেনে নিয়ে গেছেন Mohammad Abbas। কাউন্টি ক্রিকেটে বিস্তর অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও আব্বাসের ঘরানা আসলে রবিনসনের সাথে অনেকটাই মিলে যায় — গতির চেয়ে নিয়ন্ত্রণ আর শেষ মুহূর্তের মুভমেন্টের ওপর নির্ভরশীল — কিন্তু সিরিজের শুরুর দিকে তাকে “অনুপ্রবেশের অভাব” আছে বলেই মনে করা হচ্ছিল, দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে গিয়ে তবেই তার সেই আলোচিত ৫৭ রানে ৫ উইকেটের পারফরম্যান্স আসে। আব্বাস বাদ দিলে, পাকিস্তানের এই সফরের বোলিং আক্রমণকে সাধারণভাবে বছরের পর বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল বলে মনে করা হচ্ছে — সত্যিকারের গতিসম্পন্ন বোলারের অপশন প্রায় নেই বললেই চলে; স্পিনার Ali Usman লিডসে ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ উইকেট শিকার করলেও, ইংল্যান্ডের পেস-বান্ধব উইকেটে স্পিন বোলিং সাধারণত খুব একটা জায়গা পায় না, তাই আব্বাসের মতো টানা হুমকি তৈরি করবেন এমনটা তার কাছ থেকে আশা করা কঠিন। সহজ কথায়, ইংল্যান্ডের আক্রমণ একাধিক বিশেষজ্ঞ বোলার ঘুরিয়ে ব্যবহার করে, প্রত্যেকেই ভিন্ন কিছু নিয়ে আসেন, আর পাকিস্তান নির্ভর করছে একজনের ওপর, যার পেছনে গভীরতা প্রায় নেই বললেই চলে — এটাই আসল কারণ যে কারণে এই সিরিজ নির্ধারিত সময়ের আগেই ২-০ তে শেষ হয়ে গেছে।
আমার মূল্যায়ন: বোলিংয়ের ব্যবধানই আসল গল্প, পাকিস্তানের ব্যাটিং সমস্যা যতটা মনে হচ্ছে তার চেয়ে গভীর
দুই টেস্ট মিলিয়ে দুই দলের প্রকৃত পার্থক্য ব্যাটিং লাইনআপের তারকা-মূল্যে নয়, বরং বোলিংয়ের গভীরতা ও ধারাবাহিকতায় — চার ইনিংসের মধ্যে পাকিস্তান মাত্র একবার ১৫০ রান পেরিয়েছে, এটাই সব বলে দেয়। চোটের কারণে Babar Azam-এর অনুপস্থিতি দলের ছন্দ ও নেতৃত্বে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে — দুটি ম্যাচই কার্যত তৃতীয় বা চতুর্থ দিনের মধ্যেই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এই দুই ম্যাচের চিত্র দেখলে ইংল্যান্ডের আগেভাগে ২-০ তে সিরিজ নিশ্চিত করাটা মোটেও অবাক করার মতো নয়। তৃতীয় টেস্ট সেপ্টেম্বরে বার্মিংহামে শুরু হবে, কিন্তু এখন পর্যন্ত দেখানো ব্যবধান বিবেচনায়, এই সিরিজে মুখ রক্ষা করতে হলে পাকিস্তানকে আগে তাদের বোলিং আক্রমণের গভীরতার সমস্যা সমাধান করতে হবে।